প্রযুক্তি বাংলা

থাকবো না ক বদ্ধ ঘরে

রোমান্টিক গল্প

আমার ডায়েরির শেষ পাতা(রোমান্টিক গল্প)আফরোজা আক্তার

  • কল দিবি না আর
  • কি করলাম আমি
  • বলছি দিবি না , ব্যাস
  • অপরাধ টা কি
  • ঘ্যান ঘ্যান ভালো লাগে না , আজ থেকে কোন ম্যাসেজ না কোন ফোন না
  • আমাকে কি অপরাধের শাস্তি দেয়া হলো
  • ভালো লাগে না ব্যাস
  • আমি এতই খারাপ হয়ে গেলাম
  • তুই একটু না বহুত খারাপ , ভাল লাগে না তোরে , আর ম্যাসেজ দিবি না ব্যাস

,

মনে পড়ে যায় সেইদিন রাতের কথা গুলো । আমাদের শেষ ম্যাসেজ ছিল । কি জানি কি অপরাধের শাস্তি দিয়ে গেলো । আমাদের উঠা-বসা চলা-ফেরা কথা-বার্তা সবই ভুলে গেছে হয়তো । রাগটা ওর বরাবরই বেশি । ও রাগল ওর মাথা ঠিক থাকে না । তাই আমিও বেশি কিছুই বলি না । আইডি অফ , ব্লক করে রাখা কথা না বলা এইগুলো ওর নিত্যদিনের অভ্যাস আর আমার কাছে পানিভাত ।

ওর সাথে পরিচয় কলেজ থেকে আসার পথে । ধাক্কা লেগে হাত থেকে ব্যাগ পড়ে যায় । তারপর আরেকদিন কলেজে দেখা হয় । জানতে পারি সেই কলেজেই পড়ে । সময় যেতে থাকে চেনা জানা হতে থাকে তারপর ভালো লাগা আর ভালো লাগা থেকে ভালোবাসার শুভ অধ্যায় এর সূচনা । অনেক ভালোবাসতো আমায় সে । ওর কথা বলা ওর ভয়েস সবই কিছুই মানানসই ছিল । সবই চলছিল ঠিকঠাক ।

উদ্ভব ঘটে নতুন আরেকজনের । যা আমার অগোচরে । আমি হয়তো বা কিছুই জানতাম না তখন সে তার ভালোবাসা অন্যদিকে বিলি করতে থাকে । পরে জানতে পারি মেয়েটা আমার থেকে দুই বছরের জুনিয়র । একদিন আড়াল থেকেও দেখেছি কলেজের পূর্ব দিকে থাকা কড়ই গাছের নিচে দুজনে বসে গল্প করছে । ও জানতো সেইদিন আমি আসবো না তাই সুযোগ টা কাজে লাগিয়ে নেয় । আশ্চর্যের কথা ছিল মেয়েটা আমার বিষয়ে জানতো , তবুও সে ইনভোলভ হয় । বড় অবাক লাগে এটা ভেবে যে মেয়েরাও মেয়েদের সর্বনাশ করতে পারে ।

আমি বরাবরই চুপচাপ ছিলাম । কিছুই বলতে পারি নাই । না ও কে না ওই মেয়েকে । মেয়ের কি দোষ কি যদি সে নিজেই যায় । তাই চুপচাপ থাকতাম । একা একা কাদতাম , কষ্ট হতো প্রচুর তবুও চুপচাপ থাকতাম । আমাদের কথা বলা আস্তে আস্তে কমে যায় । কলেজে দেখলেও হাই হ্যালো করতো । এর বেশি না , আমরা যে একটা সম্পর্কে আছি ও সেটা ভুলেই যায় । ভালোবাসার শেষ টা এইরকম হবে জানলে ভালোবাসতে যেতাম না ।

জীবন থেকে অনেক কিছু পেয়েছি তবে বেশির ভাগটাই ছিল ধোকা ছলনা আর প্রতারণা । কিন্তু নিজে না কখনো কাউকে ধোকা দিয়েছি না ছলনা করেছি না প্রতারণা করেছি । ভালোবাসার আচ্ছাদনে আবৃত থেকে ভালোবেসে যেতেই শিখেছি । আমার মনে তার জন্যে ক্ষোভ নেই , আছে শুধু ভালোবাসা আর সম্মান । সেক্রিফাইজ জিনিস টা হয়তো আমার জন্যই তাই সেক্রিফাইজ করে যাচ্ছি এমনকি আজও করতে হচ্ছে ।

একদিন অনেক রাগ উঠে যায় । ঝগড়া হয় প্রচুর । মুখ ফোসকে ওই মেয়ের কথাও বলে ফেলি । আর তার পর থেকেই আমাদের ঝগড়া বিবাদ , এমনও দিন গেছে গালি দিয়েছিল আমায় । তবুও আমি চুপচাপ । সেইদিনের ম্যাসেজের পর আর কথা হয় নি । স্ব-ইচ্ছায় নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে চলে আসি । ও চেয়েছিল সেক্রিফাইজ করি , হ্যাঁ করেছি সেক্রিফাইজ । অনেকটাই করেছি সেক্রিফাইজ ।

সেক্রিফাইজ জিনিসটা আমার সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে গেছে । দূরে এসে তুলতুল কে নিয়ে বেশ ভালোই আছি । তুলতুল , আমার সন্তান । অবশ্য আমার বললে ভুল হবে । আমাদের সন্তান বলা উচিত । আমাদের দুজনের একটু বেশি ভালোবাসার ফসল তুলতুল ।

ভালোবাসার মাঝে এতই ডুবে গেছিলাম যে ঠিকভুল জ্ঞান হারিয়ে ফেলি । বুঝতেই পারি নি তুলতুল এসে যাবে । তুলতুল কে ২ মাসের পেটে নিয়েই চলে আসি । ইনফ্যাক্ট ও যখন ম্যাসেজ দেয় তখন আমার হাতে প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট । ভেবেছিলাম নষ্ট করে দিবো । কিন্তু পরে ভাবলাম ওর তো দোষ নেই । কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের জন্যে ওর জন্ম , ও তো ফুলের মত পবিত্র । একটা ছোট মাংসের দলা আমার মাঝে ধারণ হয়েছে যা আজকের তুলতুল । তাই চেয়েও সেইদিন নষ্ট করতে পারি নি ।

এখন তুলতুল এর বয়স ছয়মাস । জানি না সে কেমন আছে । কি করছে , রেবেকাকে নিয়েই আছে হয়তো । রেবেকা , সেই নারী যাকে দোষ দিবো না ভুল বুঝবো আমি নিজেই বুঝি না ।

বিনা বিয়েতে প্রেগন্যান্ট হয়ে যাওয়া এই সমাজে অত্যন্ত অশালীন । অনেকের কাছে তুলতুল পাপের ফসল , কিন্তু আমার কাছে আমার সন্তান পবিত্র । তাই চলে এসেছি অনেক দূরে । যেখানে আমি আর তুলতুল । সার্ভাইভ করতে অনেক কষ্ট হয়েছিল তবুও ধৈর্য ধরেছিলাম ।

তারপর তুলতুল আসে । আর এখন তুলতুলকে ঘিরেই বসবাস আমার । ও হয়তো এখন আর খুজে না আমায় । আমার নামের পাশে সবুজ বাতিটা আর হয়তো ও কে প্যারা দেয় না । আমার আইডি টা হয়তো এখনও ওর ব্লক লিষ্টে । কিন্তু আফসোস আইডিটাও এখন আর নেই ।

★★ডায়েরির কিছু পাতা ফাঁকা★★

আজ তুলতুলের স্কুলের প্রথম দিন । মেয়ে তার বাপের মত হয়েছে । এক রোখা স্বভাবের । যা বলে তাই করে , মাশা-আল্লাহ বাপের মতই সুন্দর হয়েছে । দেখতে দেখতে ৫ টা বছর পার করে দিলাম তুলতুলকে বুকে নিয়ে । স্কুলেও ভর্তি করিয়ে দিয়েছি । মাম্মাম ছাড়া কিছুই বুঝে না । তবে হুটহাট করে তার বাবাইকেও লাগে তাই প্রশ্ন করে ‘ মাম্মাম আমার বাবাই কই ‘ আবার প্রশ্ন গুলো এমনও হয় ‘ মাম্মাম সবার বাবাই আছে , আমার বাবাই কই ‘ তখন আমার উত্তর গুলো হয় ‘ মাম্মাম পাখি তোমার বাবাই বিদেশে , যখন আসবে তখন দেখবে ‘ । বাবাইয়ের নাম করে মিথ্যে মিথ্যে ড্রেস কিনে দেয়া খেলনা কিনে দেয়া আমার দুইদিন পর পর এর কাজ ।

তুলতুলও খুশি থাকে আর ওর প্রশ্ন গুলোও দমে থাকে । তবে তুলতুলকে দেখলে ওর কথা মনে পড়ে । অবিকল ওর মত হয়েছে । গাল গুলো ফুলা ফুলা , জোর-ভ্রু , চিকন ঠোঁট , বাকা হাসি সব কিছুই তার বাবাইর । এইজন্যই তার বাবাইয়ের প্রতি টান বেশি ।

সময়ের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বুক ফাটা কান্না কেউ হয়তো দেখে না , অথবা দেখলেও বুঝে না । ভালোবাসা যার যার কাছে যার যার মত । কিছু জিনিসের হয়তো মেলবন্ধন হয় না । আবার সব সম্পর্কের যে মেলবন্ধন ঘটে তা ভেবে নেওয়াটাও বোকামি ।

★★ডায়েরির কিছু পাতা ফাঁকা★★

জীবন আবার খেলা করছে আমায় নিয়ে । এটা কি করে সম্ভব । আমি গত দুইবছর যাবত যেই অফিসে জব করি তার মালিক সে । কেন যে মালিকের নাম টা দুইবছর আগে জিজ্ঞাসা করলাম না ? এখন আফসোস হচ্ছে । হুট করে জব ছাড়া যাবে না । বহুত কষ্ট করে আজ এই পজিশনে এসেছি । এই জবে দুই বছর হয়ে গেছে । ছাড়া এত সহজ না । কিন্তু তার সামনেও তো থাকতে পারবো না ।

আজ প্রায় ৫ বছর পর বুকে গহীনে থাকা কষ্টের আগুন গুলো দাবানলের মত দাউ দাউ করে জ্বলছে । এর কষ্ট অনেক , না পারা যায় কাউকে বলতে না পারা যায় কাউকে দেখাতে আর না পারা যায় কাউকে বোঝাতে ।

জীবন আর কত খেলবে আমায় নিয়ে ? এই জীবনে হয়তো আর সুখ মেলবে না ।

প্রথমে দেখে অনেকটাই অবাক হয়ে গেছিলাম মানুষটা অনেক বদলে গেছে । হয়তো সেও এখন বাবা হয়েছে । রেবেকাই কি তার বউ ? হতেও পারে আর হলেও ক্ষতি নেই । আমি বরাবরই ছিলাম তার চোখের বিষ । তার কাছে তামান দুনিয়ার সবাই ভালো কেবল আমি বাদে । তাই আর কারো কাছে ভালো হওয়ার প্রত্যাশা রাখি না । প্রথম দিনের দেখায় নিজ কেবিনে কিছু প্রশ্ন করলো আমায় ।

  • কেমন আছো ?
  • বিয়ে করেছো নিশ্চয়ই ?
  • না বলেই চলে এলে ?
  • অনলাইন হলে না কেন আর ?
  • এত বদলে গেলে কিভাবে ?
  • নিজের যত্ন নেও না এখন আর ?
  • ছেলেমেয়ে আছে ?
  • বর কি করে ?

সব প্রশ্নের উত্তর আমিও দিয়েছি । আর তা একদম সুশীল ভাবে । উত্তর টা ছিল,,,,

  • স্যার এই ফাইল গুলোতে আপনার সাইন লাগবে । আপনি সাইন করেদিলে আমি সুপারভাইজার এর কাছে জমা দিবো । তাই দয়া করে সাইন করে দিলে খুশি হবো

অনেক অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে । আমি তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি । সাইন নেয়ার পরে চলে এসেছি । কিন্তু এইভাবে আর কতদিন । এখন প্রশ্ন কাল হয়তো জোর করবে । তখন কি করবো ভাবছি

★★ডায়েরির কিছু পাতা ফাঁকা★★

আজ তুলতুল এর স্কুল বন্ধ থাকায় অফিসে সাথে করে নিয়ে যাই । নিয়ে যেতাম না যদি না সে থাকতো , কিন্তু শুনেছিলাম সে অফিসে আসবে না । আফসোস , তুলতুল আর আমি অফিস এক ঘন্টা পর সেও অফিসে চলে আসে । তুলতুলকে দেখে অনেক্ষণ চেয়ে ছিল । হয়তো নিজের কিছু স্বত্ত্বা খুজে পেয়েছিল মেয়ের মাঝে । আর তুলতুলও মোটামুটি অফিসের সবার সাথে ফ্রী । তাই সে সবার ডেস্কে ডেস্কে গিয়ে সবার সাথে মজা করে । সবাইও তুলতুলকে বেশ ভালোবাসে ।তুলতুলের আমাকে মাম্মাম বলে ডাকাতে সে অনেকটাই অবাক । ওইদিন তো সবার অগোচরে আমার দিকে কিছু অভিযোগের তীর ছুড়ে দেয় সে

  • আমার কাছ থেকে পালিয়ে সাথে সাথে বিয়েও করে নিয়েছো । এতদিন ভাবতাম আমিই হয়তো খারাপ , লম্পট , বাজে এখন দেখছি তুমিও কম যাও নি । এখানে এসে নিজের মত করে বিয়ে করে স্বামী সন্তান নিয়ে ভালোই আছো । তা তোমার স্বামী কি করেন ? সে থাকতে জব করে খাও কেন ? সে আয় রোজগার কি করে না ? নাকি ফেলে রেখে চলে গেছে ।

দারুণ হাসি পেয়েছে তবুও হাসি নি চুপ ছিলাম । ওইযে বরাবরই আমি চুপচাপ । হাল্কা হাসি দিয়ে চলে এলাম তার কাছ থেকে ।

কিছু বলতে ইচ্ছে করছে । না বলা কথা গুলো ডায়েরিতেই থাক ।

” তুমি আমায় কখনোই বুঝো নি মিষ্টার তূর্য আহমেদ । কখনোই বুঝো নি । আর আমি তোমাকে কখনো বুঝার জন্যে ঠ্যাকা দিয়েও রাখি নি । তুমি তোমার মত করেই থাকো আর আমি আমার মতই থাকি । ৫ বছর আগে যেমন সব কিছু তোমাকে দিয়ে চলে এলাম তখন যেমন শক্ত থেকেছি আজও পারবো শক্ত থাকতে । এখন আমাকে আরও শক্ত হতে হবে , কারণ এখন আমার তুলতুল এর জন্যে হলেও আমায় শক্ত হতে হবে ”

★★ডায়েরির কিছু পাতা ফাঁকা , এইবার অনেক গুলো পাতাই ফাকা★★

ডায়েরির শেষ পাতায় একটা নাম লিখা আছে ,

                    তূর্য 

,,
,,
পুরো ডায়েরি পড়া শেষ করে তূর্য । চোখের পানি গুলো সমানে বয়ে যাচ্ছে নিজের চোখ থেকে । তুলতুল তার সন্তান , এতদিন পর সে জানতে পেরেছে । আর সে না জেনে না বুঝে তুলতুলের মাকে যা নয় তাই বলে কথা শুনিয়েছে ।

অবশ্য তূর্য আর যাই পারুক না কেন নিজের অন্যায় গুলোকে আড়ালে রেখে অন্যকে কথা শুনাতে ভালোই পারে । কথার মারপেচ এ মানুষকে ফাসাতে তূর্য ভালোই পারে । তাই সে বরাবরের মত এইবারও তাকে ভুল বুঝে অনেক কথা শুনিয়ে দেয় । বরাবরের মত এই নারী সব সময় চুপচাপ , যার কাছে না আছে কোন অভিযোগ না আছে কোন অনুরোধ আর না আছে কোন কিছু পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা ।

নিজের কাছে আজ অনেক অপরাধী হয়ে গেছে তূর্য । পাপের খড়া হয়তো এইবার ঘুচবে তার ।

তাড়াহুড়োয় তুলতুলের মায়ের চলে যাওয়া , তাড়াহুড়োয় ব্যাগ পড়ে যাওয়া আর ভাগ্যের জোরে তার ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা পড়ে যাওয়া , এবং সেই ডায়েরি তূর্যের হাতে পড়া । সম্পর্কের চক্রে আবারও বাধা পড়া দুইটা ভাঙা সম্পর্ক মিলনের তাগিদে এদিক ওদিক ঘুরাঘুরিতে ব্যস্ত ।

,,
,,

পরদিন তুলতুলকে নিয়ে তার অফিসে যাওয়া । তুলতুলকে সাইডে রেখে কাজে ব্যস্ত হয়ে যায় সে । এমন সময় ম্যানেজার এর ডাক ,

  • নিলুপমা ,,,,,,,,,,,,
  • জ্বি ,
  • স্যার কেবিনে ডাকছেন আপনাকে ।
  • আচ্ছা আসছি ।

,,
,,

আবার কেন ডাক পড়েছে । আবার কোন অভিযোগ এর তীর ছোড়া হবে আমার দিকে কে জানে ।

  • স্যার আসবো
  • হু
  • জ্বি স্যার বলেন
  • অনেক কিছু লুকিয়ে গেছো নিলু
  • স্যার এটা অফিস , এখানে আপনি আমার বস আর আমি আপনার employee , আমাদের মাঝে এর থেকে বেশি আর কিছু নেই
  • নিলু তুলতুল আমার সন্তান ?
  • নাহ তুলতুল আমার সন্তান আর কারো না ।
  • মিথ্যা বলতেও শিখে গেছো ?
  • যার রন্দ্রে রন্দ্রে মিথ্যার বসবাস সে আবার অন্যের মিথ্যা যাচাই করতে পারে ?
  • নিলু তোমার একটা জিনিস আমার কাছে আছে
  • আমার জানা মতে আমি সব নিয়ে এসেছি
  • এটা কাল ফেলে রেখে চলে গেছিলে ।

ডায়েরি টা ওর হাতে বুকটায় একটা কামড় দিয়ে উঠে । এত বড় ভুল কিভাবে হয়ে গেল আমার দ্বারা ? এত কেয়ারলেস কিভাবে হলাম ? ও কি ডায়েরিটা পড়েছে ? হয়তো পড়েছে , না হয় তুলতুলকে নিজের সন্তান বলতো না ।

  • নিলু , নিলুউউ
  • হ,হ্য,হ্যা
  • নেও এটা
  • ধন্যবাদ , আসছি
  • নিলু দাড়াও
  • জ্বি বলুন
  • আমি আমার সন্তানকে কি কাছে পাবো না ?
  • আসছি ।

কোন রকম পালিয়ে গেলাম । এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আমার । তাই দিতেও পারি নি । তুলতুলকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে । কি হলো ওর আবার

  • মাম্মাম পাখি ,
  • জ্বি
  • কি হয়েছে মন খারাপ কেন ?
  • মাম্মাম আমি আইসক্রিম খাবো
  • লাঞ্চ আওয়ার হোক তারপর খেও , কেমন ?
  • এখন খেলে কি হবে মাম্মাম ?
  • তুলতুল মুখে মুখে তর্ক না , এমন করলে কিন্তু আমি তোমাকে নেক্সট টাইম নূর আন্টির কাছে রেখে আসবো । মনে যেনো থাকে , চুপচাপ বসে থাকো আর মাম্মামকে কাজ করতে দাও ।

,,
,,

দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবটাই দেখে নেয় তূর্য । তার সন্তান , তার ঔরসজাত সন্তান তুলতুল । যার দিকে দুদন্ড তাকালেই মন ভরে যায় । মনে মনে দোয়া করছে , একবার যাতে তুলতুল বাহিরের দিকে তাকায় । কারণ নিলুর কেবিনের চারপাশের পুরোটাই কাচের । এই মুহুর্তে সে নিলুর সামনে যেতে চাচ্ছে না তাই এইখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে একবার যদি মেয়েটা এইদিকে তাকায় ।

আল্লাহ পাকও হয়তো চায় বাপ মেয়ের মনের মিলন হোক । রক্তের টান বলেও তো কিছু থাকে । আচমকাই তুলতুল বাহিরের দিকে তাকায় । আর তুলতুলের তাকানো দেখে তূর্যও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দিয়ে পানি ছেড়ে দেয় । তারপর ইশারায় ডাকে তুলতুলকে ।

তুলতুল তো পাকা বুড়ি । মায়ের দিকে চেয়ে থেকে তারপর আস্তে করে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় । আর দৌড়ে তূর্যের কাছে চলে যায় ।

  • কেন ডাকো আংকেল

মেয়ের মুখে কথা গুলো যেন প্রাণ কাড়ে । পিংক কালারের ফ্রক পরা দুইদিকে দুইটা ঝুটি করা । চুলগুলো মাশা-আল্লাহ মায়ের মত সিল্কি । এক কথায় পরী লাগে তার মেয়েকে । কোলে তুলে মেয়েকে নিয়ে ক্যান্টিনে যায় তূর্য । সেখানে মেয়েকে পাশে বসিয়ে রেখে আইসক্রিম খাওয়াচ্ছে সে । এক নাগারে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে তূর্য ।

” এত সুন্দর পরী যে কিনা আমার অংশ , যে কিনা আমার কলিজা , আর আমি সেই অংশকেই চিনি নি । আমি কেমন বাবা ? “

  • তুমি আমাকে আইসক্রিম কেন দিলা
  • তুমি খেতে চাইলে
  • মাম্মাম বকবে তো
  • বকবে না
  • যদি বকে
  • আমি সামলে নিবো , তোমার বাসায় কে কে আছে ?
  • আমি আর মাম্মাম
  • তোমার বাবা ?
  • বাবাই বিদেশে থাকে তবে আমার জন্যে গিফট পাঠায় ।

ডায়েরির সাথে মেয়ের কথাও মিলে গেলো । ক্যান্টিনের বাহিরে থেকে সব খেয়াল করে নিলু । সে যতই দূরে রাখতে চাইবে তূর্য ততই তার মেয়ের কাছে আসবে ।
বাবার থেকে তার সন্তানকে কি করে আলাদা রাখবে সে আর সন্তানের থেকে তার বাবাকে কি করে আড়ালে রাখবে সে । এতটা পাষান তো নিলু না । এইবারও না হয় তূর্যকে জিতিয়ে দিবে নিলু ।

,,
,,

দুইদিন পর ,

পার্কে তুলতুলকে নিয়ে বসে আছে নিলু । তূর্যকেও আসতে বলেছে সে । আজ কিছু কথা ফাইনাল ভাবে বলে দিবে নিলু । নিজেকে সেইভাবেই তৈরি করে এসেছে নিলু ।

যথা সময়ে তূর্যও হাজির । দূর থেকে তূর্যের হাটা ফলো করছে নিলু । আগের মতই হাটে তূর্য । ৫ বছর আগের প্রাণবন্ত ছেলেটি আজ অনেক বদলে গেছে । ধোকাবাজের তালিকায়ও ফেলা যায় না আবার আগলে রাখার তালিকাতেও রাখা যায় না । তূর্য এমন একজন যে ধরাছোঁয়ার বাহিরে । মেয়ের বাবা সে আজ । বিয়েটা আজও করে নি সে । কারণ জিজ্ঞাসা করা হয় নি নিলুর ।

তূর্য সামনে এসে বসে । তুলতুল তখন বল দিয়ে খেলছে , আর নিলু তার কাজ শুরু করে ।

  • মাম্মাম পাখি ?
  • জ্বি
  • এখানে আসো মা ,
  • জ্বি মাম্মাম
  • তুমি তোমার বাবাইকে দেখতে চেয়েছিলে না ?
  • হু
  • ইনি তোমার বাবাই ,
  • আমার বাবাই ????
  • হ্যাঁ মা , তোমার বাবাই

বাচ্চা মেয়েটার কিছু বুঝার নেই । বাবাইকে দেখে জড়িয়ে নেয় তার বাবাইকে । আর তূর্যও মেয়েকে জড়িয়ে নিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দেয় ।

নিলুও বেশ খুশি । ফিরিয়ে দেয় বাবাকে তার সন্তান আর সন্তানকে ফিরিয়ে তার বাবাকে । আজ নিলু অনেকটাই দ্বায় থেকে মুক্ত হয় ।

  • মাম্মাম পাখি
  • জ্বি
  • বাবাইকে তো পেয়েছো , এখন মাম্মাম কয়টা কথা বলবো শুনবা ?
  • হু
  • বাবাই তো এতদিন ছিল না এখন এসেছে , তুমি বাবাইর সাথে থাকবে ?
  • তোমার সাথেও থাকবো বাবাইর সাথেও থাকবো ।
  • আমার কাছে তো এতদিন ছিলে এখন না হয় বাবাইর সাথে থাকো
  • আমার বাবাই চাই আমার মাম্মাম চাই

তূর্য অবাক নয়নে নিলুর দিকে তাকিয়ে আছে । নিলু কি মানুষ নাকি অন্যকিছু । আজকেও তূর্যকে জিতিয়ে দিতে নিজের কলিজাকে তূর্যের হাতে তুলে দিতে এসেছে । নিলুর চোখের পানি গুলো চিক চিক করছে । মনে হচ্ছে এখনি পড়ে যাবে । অন্যদিকে নিলু তুলতুলকে বুঝাতে ব্যস্ত । তূর্য তুলতুলকে সাইডে রেখে নিলুর দিকে তাকিয়ে বসে ।

  • নিলু আমরা কি পারি না আবার এক হতে ?
  • সময়টা পাড় হয়ে গেছে তূর্য সাহেব
  • বদলায় নি কিছুই
  • অনেক কিছু বদলে গেছে
  • আমি আগের মতই আছি
  • রেবেকা চলে গেলো কেন ?
  • বেইমানী করে গেছে যেমন টা আমি করেছিলাম তোমার সাথে
  • অথচ এই বেইমানের জন্যেই আমাকে সরিয়ে দিয়েছেন
  • মাফ করা যায় না ?
  • কোন অভিযোগ তো করি নি
  • ক্ষমা করে দেও
  • মনে পড়ে লাস্ট ম্যাসেজ গুলো , আর তার কয়েকদিন আগে দেয়া গালি গুলো
  • ভুল করেছিলাম আমি
  • তুই থার্ডক্লাস , লো-ক্লাস , আরও অনেক কিছুই আমি । আমার সাথে যাবে না কখনোই আপনার ।
  • তুলতুলকে আমার চাই সাথে তোমাকেও
  • তুলতুল আপনার , আপনার রক্ত তার শরীরে । আমি সরে যাবো । তুলতুল বুঝে যাবে আস্তে আস্তে সব
  • এত পাষান হলে কিভাবে ?
  • মন টাই মরে গেছে । যাই হোক কাল তুলতুলকে নিতে আসবেন , আমি সব রেডি করে রাখবো
  • তুলতুল থাকবে না
  • থাকবে , আমি মাঝে মাঝে দেখা করতে যাবো
  • নিলু সব কিছু ভুলে গিয়ে এক হওয়া যায় না ?
  • দুইজনের রাস্তা ৫ বছর আগেই দুইদিকে বেকে গেছে , আর তো জোড়া লাগবে না । কাচ ভেঙে গেলে জোড়া লাগে কিন্তু দাগ যে থেকে যায়
  • এইভাবেই কি সারাজীবন কাটাবো আমরা ?
  • আপনি এগিয়ে যান , তবে তুলতুলকে দেখে রাখবেন
  • আর তুমি ?
  • আমি কখনো আপনার মনে ছিলাম না । যাই হোক আসছি , মাম্মাম পাখি বাবাইকে বাই দেও , কাল বাবাই আসবে নিতে ।
  • বাই বাই বাবাই
  • নিলু দাড়াও ,
  • হুম
  • চলে যাবে একা ফেলে ?
  • আমার ডায়েরির শেষ পাতায় একটাই নাম সারাজীবন থেকে যাবে আর তা হচ্ছে তূর্য ।
  • ওইখানেই রেখে দিবে আমায় ?
  • ডায়েরিটা অন্তত বেইমানী করবে না । আমার ডায়েরির শেষ পাতায় আপনি ছিলেন , আপনি আছেন , আপনিই থাকবেন । আমি তূর্য নই আমি নিলু যে শুধু সেক্রিফাইজ এর জন্যে জন্মেছিল । আজও সেক্রিফাইজ করে যাচ্ছে । আসছি ,

,,
,,
,,

সব কিছুর মাঝে তুলতুলের ভবিষ্যত অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে । তার বাবা মা দুজনকেই প্রয়োজন । কিন্তু নিলু একাধারে তূর্যকে জিতিয়ে দিতে গিয়ে বাচ্চার মনে কষ্ট দিয়ে ফেললো । নিলু তার বিবেকের কাছে স্থির । সে চায় তুলতুল তার বাবাইকেও পাক । তাই সে তার কর্তব্য গুলো যথাযথ ভাবেই পালন করে নিজেকে নিঃস্ব করে রেখে দিয়ে গেলো । যেতে যেতে নিলুর মনের কথা গুলো তার চোখের পানি হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে ।

” বরাবরের মত নিলু আজও তোমায় জিতিয়ে দিয়ে গেলো তূর্য সাহেব । তুমি সব সময় চেয়েছিলে সেক্রিফাইজটা আমিই করি । দেখো কথা কিন্তু রেখেছি । সেক্রিফাইজ আজও আমিই করে গেলাম কিন্তু এইবারের সেক্রিফাইজটা অনেক বড় ছিল তূর্য সাহেব । ভালোবাসি তোমাকে , তোমাকে কষ্টে রাখি কিভাবে ? আমার ডায়েরির শেষ পাতায় তোমার নামটা আজীবন রয়ে যাবে । নাই বা হলাম তোমার সাথী । তুমি তো আছো আমার ডায়েরির শেষ পাতায় ।

       ★★★সমাপ্ত★★★

আমারডায়েরিরশেষপাতা(রোমান্টিক গল্প)আফরোজা আক্তার

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *